
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম।
অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য ৪ লক্ষ ২৬৬
কোটি টাকার ব্যয় সম্বলিত একটি বাজেট পেশ করেছেন। টাকার অংকের দিক থেকে এই
বাজেট বাংলাদেশের জন্য সর্বকালের বৃহত্তম বাজেট। এই বাজেট বিশ্লেষণ করে
আমরা যুগপৎ বিস্মিত, ক্ষুব্ধ এবং হতাশ হয়েছি। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আমরা
বলেতে পারি এই বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয়। কেবলমাত্র অলীক স্বপ্ন-কল্পনাই এই
প্রস্তাবিত বাজেটের ভিত্তি। বর্তমান সরকার যে সব মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে
সেগুলোর কাজ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করাই সরকারের অঘোষিত
লক্ষ্য। এর জন্য প্রয়োজন হবে প্রচুর অর্থের। সেই অর্থের যোগান দেখানোর
জন্যই জনগণের ওপরে করের বোঝা চাপিয়ে একটি গাণিতিক হিসেবের বাজেট হিসেবে এই
বাজেট পেশ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনের পূর্বে সরকার এইসব প্রকল্পকে
নির্বাচনী প্রচারনার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। তারা বলতে চাইবে দেশের
একমাত্র সার্থক উন্নয়নকারী তারাই।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট ব্যয়ের লক্ষ্য ছিল ৩ লক্ষ ৪০ হাজার ৬ শত ৫ কোটি
টাকা। সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয়ের মাত্রা নি¤œমুখী সংশোধন করে স্থির করা
হয়েছে ৩ লক্ষ ১৭ হাজার ১ শত ৭৪ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মার্চ ২০১৭
পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয়ের পরিমান ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৩ শত ৩৩ কোটি টাকা।
এনবিআর-ট্যাক্স রাজস্ব এর লক্ষ্য ছিল ২ লক্ষ ২ হাজার ১ শত ৫২ কোটি টাকা।
পরে এই অংককে সংশোধন করে ১ লক্ষ ৮৫ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্য নির্ধারণ করা
হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কাক্সিক্ষত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ
হয়েছে। ঐ বাজেটে বহিঃস¤পদ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৭ হাজার ৩ শত ৫ কোটি
টাকা। সংশোধিত বাজেটে এই লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ৭ শত ৭১ কোটি টাকায় নামিয়ে
আনা হয়েছে। কিন্তু এই সূত্র থেকে এসেছে মাত্র ২ হাজার ৫ শত ৫১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং বৈদেশিক সূত্র থেকে স¤পদ আহরণ
লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম হয়েছে। তাই আমরা সন্দিহান, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের
জন্য বাজেটের যে আকার প্রস্তাব করা হয়েছে সেটি অর্থায়নের জন্য দেশি এবং
বিদেশি সূত্র থেকে কাক্সিক্ষত মাত্রায় স¤পদ সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না।
২০১৬-১৭ অর্থবছরের অনুন্নয়ন খাত ও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ বিশ্লেষণ করলে দেখা
যায় যে সংশোধিত বাজেটের অনুন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৯.১% এবং উন্নয়ন ব্যয়
জিডিপির ৫.৯%। অর্থাৎ জিডিপির অংশ হিসেবে উন্নয়ন ব্যয় অনুন্নয়ন ব্যয়ের
তুলনায় ৩.২% কম। অথচ একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অনুন্নয়ন ব্যয় উন্নয়ন
ব্যয়ের তুলনায় কম থাকাই কাক্সিক্ষত। বাজেটের উন্নয়ন ব্যয়ের হিস্যা বাড়ানো
সম্ভব হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অধিকতর ত্বরান্বিত করা সম্ভব।
একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৭ সনের মে মাস পর্যন্ত ১১ মাসে
বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের মাত্র ৬৫% বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থবছরের শেষ ১ মাসে
উন্নয়ন বাজেটের অবশিষ্ট অর্থ ব্যয় দেখাতে হলে সেই ব্যয় দুর্নীতি আর অপচয়
ছাড়া আর কিছুই নয়। আমাদের স¤পদ সীমিত। সীমিত স¤পদের যথাযথ ব্যবহার দেশের
প্রতিটি করদাতা নাগরিকের কাম্য।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ লক্ষ ২ শত ৬৬ কোটি টাকা
যা জিডিপির ১৮%। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই বাজেটের অনুন্নয়ন খাতের ব্যয়ের পরিমান
২ লক্ষ ৪১ হাজার ২ শত ৫৩ কোটি টাকা। এই ব্যয় জিডিপির ১০.৮% এবং উন্নয়ন
খাতে বরাদ্দ প্রস্তাব ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৩ শত ৩১ কোটি টাকা যা জিডিপির ৬.৯%।
এর বাহিরে স্বায়েত্বশাসিত সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য
বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৭ শত ৫৩ কোটি টাকা। এর ফলে মোট এডিপির আকার
দাঁড়াবে ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা যা জিডিপির ৭.৪%। অর্থমন্ত্রী তাঁর
বাজেট ভাষণে উল্লেখ করেছেন কিছু সংখ্যক বড় প্রকল্পের জন্য প্রকল্প সাহায্য
ব্যবহার করবেন। এ কারনে বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় এডিপির আকার আসন্ন
অর্থবছরে ৩৮.৫% বৃদ্ধি পাবে। এক লাফে এডিবির জন্য ৩৮.৫% ব্যয় বৃদ্ধি অলীক ও
অবাস্তব। একদিকে প্রস্তাবিত বাজেটের অনুন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ১০.৮% এবং
অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় জিডিপির ৭.৪%। এ থেকে ¯পষ্টতই প্রতীয়মান হয়
প্রস্তাবিত বাজেটে অতীতের ধারায় অনুন্নয়ন ব্যয়ের প্রাধান্য অব্যাহত থাকছে।
এত বিশাল আকারের বাজেটেও এই ধারা থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব হল না, এটা
অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমান ১ লক্ষ ১২ হাজার ২ শত ৭৫ কোটি। এই
ঘাটতি পূরণের জন্য বৈদেশিক সূত্র থেকে প্রাপ্তি ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯ শত ২৪
কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে এর পরিমান ২৮ হাজার ৭ শত
৭৭ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটের তুলনায় বৈদেশিক সূত্রের মাধ্যমে ঘাটতি
পুরনে ৮০% বৃদ্ধি ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক সূত্রগুলো যে ঋণ বা অনুদান
দেয়ার প্রতিশ্রুতি করে তা দক্ষতার অভাবে পুরোমাত্রায় ছাড় করানো সম্ভব হয়
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পগুলো শুরু করাই সম্ভব
হয় না। সুতরাং প্রস্তাবিত বাজেটে এই সুত্রের ৮০% প্রবৃদ্ধি একেবারেই
অসম্ভব, কল্পনা করাও কঠিন। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে বাজেট প্রণয়নকারীরা
নিছক হিসেবের অংক মেলাতে গিয়ে তাদের পছন্দসই সংখ্যাটি বসিয়ে দিয়েছেন। একটি
গবেষণা প্রতিষ্ঠান মন্তব্য করেছে, অর্থায়নের সব উৎস দেখার পর যখন ব্যয়ের
হিসাব মিলছে না, তখন পুরোটাই বৈদেশিক সাহায্য থেকে আসবে বলে ধরে নিয়ে যোগ
করে দেয়া হয়েছে। যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে সেটা ৪ বছরেও বাংলাদেশ করতে
পারেনি। ২০১৫-১৬ সালে সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ডলার বৈদেশিক সাহায্য এসেছিল, আর
প্রস্তাবিত বাজেটে সেটাকে ৭৬০ কোটি ডলার দেখানো হয়েছে যা ১৮১% বেশি, যা
মোটেই অর্জন করা সম্ভব না। এটা জাতির সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা মাত্র।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকিং সূত্র থেকে জিডিপির ১.৩% পূরণ
করা হবে। এর ফলে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং নির্ধারিত
মূল্যস্ফীতির স্তর ধরে রাখা কঠিন হবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ঘাটতি অর্থায়ন করা
হয়েছিল ৯৭ হাজার ৮ শত ৫৩ কোটি টাকা। এটি সংশোধিত বাজেটে সামান্য বৃদ্ধি করে
৯৮ হাজার ৬ শত ৭৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ ঘাটতি অর্থায়নের
পরিমান মোটামুটি অপরিবর্তিত থেকেছে। বৈদেশিক সূত্র থেকে ঘাটতি অর্থায়নের
পরিমান ধরা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩ শত ৫ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৯%। কিন্তু
অনিবার্যভাবেই বৈদেশিক সূত্র থেকে অর্থায়ন হ্রাস করে ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৭
শত ৭১ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১.৩%। এ কারনে অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে ঘাটতি
অর্থায়নের পরিমান ৬৯ হাজার ৯ শত ৩ কোটি টাকা ধার্য কর হয়েছে। এর ফলে ব্যাংক
বহির্ভূত উৎসগুলোর উপর, যেমন, সেভিং সার্টিফিকেট এর উপর নির্ভরশীলতা
বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এপ্রিল পর্যন্ত যে অংকের সেভিংস সার্টিফিকেট বিক্রয়
করা হয়েছে তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি। অর্থমন্ত্রী
বলেছেন, সেভিংস সার্টিফিকেট এর সুদের হার হ্রাস করা হবে। সেভিং সার্টিফিকেট
এর সুদের হার হ্রাস করা হলে এই সূত্র থেকে প্রাপ্তিও কমে যাবে এবং এর উপর
নির্ভর করে ঘাটতি অর্থায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। প্রস্তাবিত বাজেটেও ঘাটতি
অর্থায়নের জন্য বৈদেশিক সূত্র থেকে বড় ধরনের প্রাপ্তি নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রীকে এই অর্থবছরেও এক্ষেত্রে নিরাশ হতে হবে। অর্থনীতি শাস্ত্রের
বিচারে ঘাটতি অর্থায়ন অবাঞ্ছিত কিছু নয়। কিন্তু এর ফলে জাতির বর্তমান ও
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর ঋণ পরিশোধের বোঝা চেপে বসে।
ঘাটতি অর্থায়নের মাধ্যমে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বিশেষ করে মেগা-উন্নয়ন
প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চলেছে সরকার। বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে
ধীরগতি এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়িত করতে না পারার অজুহাতে
উদ্দেশ্যপ্রণেদিতভাবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বাস্তবায়নাধীন অনেক
মেগা প্রকল্পের ইউনিট প্রতি ব্যয় স¤পর্কে দায়িত্বশীল মিডিয়া কিছু মারাত্মক
প্রশ্ন তুলেছে। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায়, বিশেষ করে ভারতের
তুলনায় বাংলাদেশে প্রকল্পগুলোর ব্যয় ৫ থেকে ৯ গুন বেশি। এর ফলে প্রশ্ন
উঠেছে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির। এসব বিষয়ে মিডিয়াতে প্রশ্ন উঠলেও সরকার আজ
পর্যন্ত খোলামেলা ভাবে হিসাব কষে দেখাননি কেন প্রকল্প ব্যয় এত বেশি। এ সকল
মেগা প্রকল্পে যে মেগা চুরি হচ্ছে তা এখন সর্বজনবিদিত। বলা বাহুল্য, সরকার
ঘনিষ্ট কিছু সুবিধাভোগীরাই কেবল এ সকল প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে
জড়িত।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
ইতোমধ্যে বাজারে চালের দাম, বিশেষ করে মোটা চালের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই বৃদ্ধি কেজি প্রতি ১০ টাকার কম নয়। এখনও এ দেশের অর্থনীতিতে খাদ্য
মূল্যস্ফীতির প্রভাব সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির উপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল ১০ টাকা কেজিতে চাল নিশ্চিত করা।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী ৬ জুন ২০১৭ স্বর্ণা/চায়না ইরি মোটা চালের দাম ছিল ৪৫
থেকে ৪৬ টাকা। এক মাসে এই বৃদ্ধির হার ৪.৬%। এক বছর পূর্বে জুন মাসের ৬
তারিখে মোটা চালের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩৪ টাকা। বাৎসরিক মুল্যবৃদ্ধির হার
৪২.১৯%। একই তারিখে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা। এর এক
বছর আগে একই ধরনের তেলের দাম ছিল ৭৯ থেকে ৮৪ টাকা। ২৮ মে ২০১৭ তারিখে
প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী প্রতি কেজি মোটা চালের দাম
বাংলাদেশে ৪৮ টাকা, ভারতে ৩৪.৩৩ টাকা, পাকিস্তানে ৩৮.৫৪ টাকা, থাইল্যান্ডে
৩৭.৮১ টাকা এবং ভিয়েতনামে ৩৩.৬২ টাকা। এই হিসেবে সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে
বেশি দামে চাল বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের মানুষের গড়ে ৬৫%
ক্যলোরি আসে চাল বা ভাত থেকে। প্রতিদিন তারা খাবারের পেছনে যে অর্থ ব্যয়
করে, তার ২৭ শতাংশ যায় চাল কিনতে। চালের দাম বাড়লে গরীব মানুষ ভাত খাওয়া
কমিয়ে দেয়। চালের দাম ৪৮ টাকা হয়ে যাওয়ায় প্রায় ২ কোটি নি¤œবিত্ত পরিবারের
খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে। কয়েক বছর ধরে সরকার চাল ও
অন্যান্য খাদ্য বিষয়ে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহনে ব্যর্থ হওয়ায় আজ চালের
দাম জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়ে তাদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
চালের দাম বাড়ার প্রবণতা থেকে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হিসাবটি আলাদা করা যায়
না। নতুন ফসল উঠলে চালের দাম কমে, এটাই বাংলাদেশের চিরায়ত চিত্র। বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান ব্যুরো হিসেব দিয়েছে খাদ্য শস্য উৎপাদন এবার ২.৫% বেড়েছে।
প্রশ্ন হল ধান উৎপাদন যদি আগের বছরের বা¤পার ফলনের চেয়ে ২.৫ শতাংশ বাড়ে
তাহলে দাম কেন এত চড়া? বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষির
অবদান নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে ১৪.৭৯%। এবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো
জিডিপির যে হিসাব করেছে তাতে কৃষি খাতে ৩.৪% প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের ৬০ ভাগ আসে বোরো ফসল থেকে। বাকি ৪০ ভাগ আসে আউশ ও
আমন থেকে। আউশের উৎপাদন ৭% মত কম হয়েছে। আমনের উৎপাদন আগের বছরের পর্যায়ে
স্থির রয়েছে। বোরোর উৎপাদনে এবার দুর্যোগ ও হাওরে বিপত্তির কারনে ৬/৭ লক্ষ
টন কম উৎপাদন হবে বলা হচ্ছে। এই হিসাবে কোন ভাবেই খাদ্য উৎপাদন বেশি হওয়ার
কথা নয়। একই কারণে কৃষিতে ধনাত্মক প্রবৃদ্ধির সম্ভবনাও বাস্তব সম্মত নয়।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
পরিসংখ্যানের তেলেসমতি ঘটিয়ে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের চমক দেখানো হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী উভয়ই বলেছেন বিদায়ী ২০১৬-১৭ অর্থবছরে
জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৪%। এদিকে পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী
শিল্পখাতে ৬.২৬% প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যার মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে স্থির
মুল্যে উৎপাদন বেড়েছে ১০.৯৬%। সার্বিক শিল্পখাত থেকে এখন জাতীয় অর্থনীতিতে
৩২.৫% অবদান আসে। এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত থেকে আসে ২১.৭৫%। এবার
ম্যানুফ্যাকচারিং এ ১০.৯৬% প্রবৃদ্ধি হিসাব করা হয়েছে। বাংলাদেশের
আভ্যন্তরীণ বাজারে শিল্প পণ্যের চাহিদার তুলনায় রপ্তানি বাজারের চাহিদা
বেশি। অথচ যে সময়ে শিল্পের উৎপাদন ১০.৯% বেড়েছে বলা হয়েছে সে সময়ে রপ্তানি
বেড়েছে ৩% এর কিছু বেশি। শিল্পের কাঁচামালের আমদানি এলসি বেড়েছে ১.৫% এর
মত। এই বিশ্লেষণে এটি ¯পষ্ট যে গত অর্থবছরে ৭.২৪% প্রবৃদ্ধির বিষয়টি
প্রশ্নবিদ্ধ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে জিডিপি
প্রবৃদ্ধির হার ৭.২৪% প্রাক্কলন করা হলেও বিশ্ব ব্যাংক তাদের প্রকাশিত
প্রতিবেদন 'গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টস' এ চলতি অর্থবছরের জিডিপি
প্রবিদ্ধির হার ৬.৮% প্রাক্কলন করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের হিসাবের চেয়ে
বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্কলন ও পূর্বাভাসকেই নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবসম্মত বলে
বিবেচনা করেন অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা। তারা বলছেন, রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স
প্রবাহে মন্দা, বেকারত্ব বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সাম্প্রতিক বন্যায়
হাওরাঞ্চলের ফসল হানি বিবেচনা করলে প্রবৃদ্ধি আরও কম হওয়ার কথা। বর্তমানে
রেমিটেন্স প্রবাহে মন্দা থাকায় উদ্বেগ কিছুটা বাড়ছেই। বিশেষ করে
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতিতে কড়াকড়ি এবং মধ্যপ্রাচ্যের
তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর মন্দা ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধরনের
ধ্বস দেখা দিলে বাংলাদেশের সামষ্টিক ভোগ ও বিনিয়োগেও তার নেতিবাচক প্রভাব
পড়বে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি
প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬.৪% নামতে পারে বলে বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে।
সরকার পরিসংখ্যান জনিত বিভ্রাট ঘটিয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়িয়ে দেখানোর
সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। প্রশ্নবিদ্ধ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখিয়ে
সরকারের নীতিনির্ধারকরা এক ধরনের আত্মতুষ্টিজনিত রোগে ভুগছেন।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
প্রশ্ন হল এই সরকারের দাবীকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যাচ্ছে কোথায়? সম্প্রতি
প্রকাশ পাওয়া গ্লোবাল ফাইনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (এঋও) এর প্রতিবেদনটি
ব্যাপক আলোচনায় এসেছে। এই প্রতিবেদনে বলে হয়েছে, কেবল ২০১৩ সালে দেশ থেকে
৭৮ হাজার কোটি টাকা এবং ২০১৪ সালেই দেশ থেকে ৭২ হাজার কোটি টাকা পাচার
হয়েছে। ২০১৪ সালের পাচারের এই পরিমানটি জিডিপির প্রবৃদ্ধির ৪% এর মত।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ৭% এর মধ্যে যদি ৪% বাহিরে পাচার হয়ে যায় তাহলে দেশের
অর্থনৈতিক লেনদেনে কিভাবে প্রবৃদ্ধির প্রভাব লক্ষণীয় হবে? এ থেকে
বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতির বিষয়টি ¯পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন হল কেন
এদেশের অনেক বিনিয়োগকারী দ্বৈত-নাগরিকত্ব গ্রহন করেছে? কেন তারা তাদের অর্থ
দেশে বিনিয়োগ করার চাইতে বিদেশে রাখাটাই পছন্দ করছে? এই পাচার হওয়া টাকার
একটা বড় অংশ হলো অবৈধ উপায়ে অর্জিত কালো টাকা। আর পাচার হওয়ার পেছনে
কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দেশে বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক
অস্থিতিশীলতা, দেশের অর্থনীতির প্রতি আস্থার অভাব, দেশের বাইরে একটি
নিরাপদ বলয় তৈরি করে রাখা যাতে সুযোগ মতো বেরিয়ে যাওয়া যায়, আমাদের
ব্যাংকগুলোর করুণ অবস্থা এবং সর্বোপরি লুটের টাকার একটি নিরাপদ আশ্রয়
তৈরি। বিদেশে বাংলাদেশের এত বিরাট অংকের টাকা চলে যাচ্ছে অথচ সরকার
একেবারেই নীরব। রহস্যজনকভাবে বিশাল অংকের এই টাকা ফিরিয়ে আনার কোন সরকারী
উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
বাংলাদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে। একটি জাতীয় দৈনিকের
হিসেব অনুযায়ী মার্চ ২০১৭ শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩
হাজার ৪ শত ৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের মোট ঋণের ১০.৫৩%। ২০১৬ মার্চে খেলাপি
ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪ শত ১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪
হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরও ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে।
যার মাধ্যমে এসব মন্দ ঋণ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। এ তথ্য
খেলাপির হিসাবে নিলে দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি
টাকা। হিসাবটি আঁতকে ওঠার মতো। ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি টিম
সোনালী ব্যাংক থেকে হলমার্ক গ্রুপ অবৈধভাবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার ঋণ
নেয়ার জালিয়াতি শনাক্ত করে। এরপর একে একে বিসমিল্লাহ গ্রুপ, ডেসটিনি
গ্রুপের ঋণ জালিয়াতি এবং বেসিক ব্যাংকসহ দেশের অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত ও
বেসরকারি ব্যাংকে ঋণ জালিয়াতি ও জনগণের অর্থ লোপাটের লোমহর্ষক খবর দেশের
গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে থাকে। লুটেরারা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগার
বাংলাদেশ ব্যাংকেও হাত দিয়েছে। তারা ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার বা ৮০৮ কোটি টাকা
লুটে নিয়েছে। সরকার এই বিষয়ে অনুষ্ঠিত তদন্ত প্রতিবেদনটিও ধামাচাপা দিয়ে
রেখেছে। কার স্বার্থে বা কাকে আড়াল করার জন্য এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা
হচ্ছে না তা জাতি জানতে চায়।
দেশে কোথাও সুশাসন নেই; সুশাসন থাকলে সর্বক্ষেত্রে এই অরাজকতা চলতো না।
ব্যাংকে লুটপাট সরকারের পাশের লোক না হলে কেউ করতে পারে না। এতে সরকারের
সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা রয়েছে বলে ¯পষ্ট। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে
ঋণ জালিয়াতি এবং অর্থ লোপাট সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত দেশের পত্রপত্রিকায়
প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন-নিবন্ধে প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। বলা বাহুল্য, এই
অর্থ লোপাট ও অর্থ পাচারের কোনো ঘটনার বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা আজো
নেয়া হয়নি, যা রীতিমতো বিস্ময়ের ব্যাপার।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
একটি সূত্র মতে, লুটপাটের মহোৎসবে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ
দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। জনগণের করের টাকায় মেটানোর চেষ্টা চলছে
এই মূলধন ঘাটতি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে সরকারি ব্যাংকের মূলধন
ঘাটতি পূরণে ২০১১-১২ থেকে চলতি অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি
টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এমন কী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটেও ২ হাজার কোটি টাকা
মূলধন বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। বাজেট বক্তৃতায় বুদ্ধিমান অর্থমন্ত্রী অবশ্য
বিষয়টি চেপে গেছেন। সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা টাকা শুষে নিয়ে টিকিয়ে
রাখার চেষ্টা চলছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু খেলাপি ঋণ গ্রহীতারা রয়ে গেছে ধরা
ছোঁয়ার বাইরে। অর্থমন্ত্রী তাদের চোখে দেখেন না। তার চোখ আটকে যায়
মধ্যবিত্তের তিলতিল করে জমানো ১ লক্ষ টাকার ওপর। সরকারি ব্যাংকগুলো দলীয়
লুটেরাদের হাতে তুলে দেওয়ার পর সরকার এখন বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে
পরিবারতন্ত্র কায়েমের জন্য আইন সংশোধন করে এক পরিবার থেকে দুই জনের স্থলে
চার জন পরিচালক এবং পরপর দুই মেয়াদের পরিবর্তে তিন মেয়াদ অর্থাৎ টানা নয়
বছর পরিচালক থাকা বৈধ ঘোষণা করেছে। এটি কেবল অনৈতিকই নয়, সাধারণ জনগণের
পকেট মেরে দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের প্রশ্রয় ও উৎসাহ দেবার শামিল। যেখানে
ব্যাংকিং ব্যবস্থা সংস্কার করে আর যেন এই ধরনের লুটপাট না হয় সে ব্যবস্থা
গ্রহণ করা উচিত, সেখানে সরকার সংস্কারের দিকে না গিয়ে আরও সহজে লুটপাটের
ব্যবস্থা করছে।
নির্বিচারে ব্যাংকের অর্থ লোপাট এবং বিদেশে ঢালাও অর্থ পাচারের পরিণতিতে
দেশের অর্থনীতির আজ যেই দৈন্যদশা, তা সামাল দেয়ার নিমিত্তে অর্থমন্ত্রী
জনগণ থেকে সম্ভাব্য যেকোনো উপায়ে রাজস্ব আদায়ের সংস্থান রেখে এবং বৈদেশিক
ঋণ ও অনুদান লাভের স্বপ্নজাল বুনে এক উচ্চমাত্রার বিলাসী বাজেট প্রণয়নে
নেতৃত্ব দিয়েছেন। অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ হয় না। আর বধির হলেই বজ্রনাদ থেমে
থাকে না।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আয় ও কর্পোরেট কর ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার
৮ শত ৬৭ কোটি টাকা। আমদানি ও রপ্তানি কর ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১ শত ৫৩ কোটি
টাকা, মূল্য সংযোজন কর (ঠঅঞ) ধরা হয়েছে ৯১ হাজার ৩ শত ৪৪ কোটি টাকা এবং
স¤পুরক কর ধরা হয়েছে ৩৮ হাজার ২ শত ১২ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে বিবেচনায়
নিলে কর কাঠামোটি অত্যন্ত পশ্চাদমুখী (জবমৎবংংরাব)। বেশির ভাগ কর আসবে
পরোক্ষ সূত্র থেকে। পরোক্ষ করের বোঝা ধনী-গরীব নির্বিশেষে সব শ্রেণীর
ভোক্তাদের উপর সমান হারে বর্তায়। এই ধরনের কর জনকল্যাণ বিরোধী। মনে রাখা
দরকার একজন দরিদ্র মানুষের দেওয়া ১০ টাকা কর একজন ধনী মানুষের দেওয়া ১০
টাকা করের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টদায়ক। যদিও প্রতিটি ১০ টাকার বাজার মুল্য
সমান, তা হলেও গরীব ও ধনীদের কাছে এর গুরুত্ব এক রকম নয়। উপযোগবাদী
দার্শনিক (টঃরষরঃধৎরধহ চযরষড়ংড়ঢ়যবৎ) জেরেমি বেনথাম চেয়েছিলেন সরকার এমনভাবে
দেশ চালাবেন যাতে ‘এৎবধঃবংঃ মড়ড়ফ ড়ভ ঃযব মৎবধঃবংঃ হঁসনবৎ’ নিশ্চিত হবে। এই
বাজেট রাজস্ব সংগ্রহের প্রস্তাবনায় এই নীতি থেকে অনেক দূরে সরে গেছে।
কারণ, কর আরোপের ক্ষেত্রে পরোক্ষ করের উপর অতি-নির্ভরশীলতা। কর ব্যবস্থা
সংস্কারে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। এ বাজেটে সর্বনি¤œ আয়করযোগ্য আয়ের ক্ষেত্রে
কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। মূল্যস্ফীতির উপর ভিত্তি করে এই স্তরটি নির্ধারণ
করা যেত।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
এ বাজেটে প্রস্তাবিত ১৫% ভ্যাট দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্বোচ্চ ।
ভারতে ভ্যাটের হার ১২.৫%, নেপালে ১৩%। মালদ্বীপে সব ক্ষেত্রে ৬% ও পর্যটন
খাতে ১২%। তাছাড়া বাংলাদেশের প্রতিযোগী ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও
মিয়ানমারে এর হার ১০%। এবারের বাজেটে আরোপিত ভ্যাট প্রায় সব পণ্যের ওপর
প্রযোজ্য। তবে অর্থমন্ত্রী মানুষকে বোকা বানানোর লক্ষ্যে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের
লম্বা তালিকা যোগ করে বাহাবা কুড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে
জীবন্ত ঘোড়া, গাধা, খচ্ছর ও ঘোটক, নানা ধরনের শুকরের মাংশ, টার্কি এবং
বিভিন্ন জীবন্ত পক্ষী সহ বেশকিছু পণ্য সামগ্রী। এই তালিকায় বেশ কিছু পণ্য
রয়েছে যেগুলো বাংলাদেশের সাধারন মানুষ আদৌ ব্যবহার করে না এবং এদেশের অনেক
মানুষের জীবদ্দশায় একবারও দরকার পড়ে না। এভাবে শুন্য ভ্যাট তালিকাকে
প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। উচ্চহারে ভ্যাট আহরণের ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে,
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে, জীবন যাত্রার ব্যয় বাড়বে, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত,
নি¤œবিত্ত, ও দরিদ্র মানুষ ভয়ানক দুর্ভোগের মধ্যে পড়বে।
আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর আরোপিত ১৫% ভ্যাটের হার ভোক্তাদের সহনীয়
পর্যায়ে হ্রাস করার দাবী জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
অর্থমন্ত্রী বলেছেন, '১৫% ভ্যাট আরোপের ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম
কমবে এবং কোন অবস্থাতেই কোন পণ্যের দাম বাড়বে না'। অর্থমন্ত্রী কিসের
ভিত্তিতে এমন উদ্ভট তত্ত্ব উপস্থাপণ করেছেন তা আমাদের বোধগম্য নয়। এই
কারণেই বোধহয় তিনি বলেছেন, 'জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট দিয়েছি'।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা,
বাজেট পেশের দিনেই বাজেটের বাইরে বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। বিদ্যুতের ওপর
১৫% ভ্যাট প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে বেড়ে যাবে উৎপাদন খরচ।
বাড়বে মূল্যস্ফীতি। বিদ্যুৎ-ভ্যাট দেশীয় উৎপাদনের বিশাল ক্ষেত্র জুড়ে বিরূপ
প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাগাড়ম্বর করেই চলেছে সরকার,
অথচ ঢাকা সহ গ্রাম অঞ্চলে ঘন্টার পর ঘন্টা লোড শেডিং এর কবলে পড়ে জনজীবন
অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
কৃষকের ব্যবহৃত জনপ্রিয় কৃষিযন্ত্র ট্রাক্টর এর ওপর বাজেটে ১৯ শতাংশ বাড়তি
শুল্ক প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজারে এখন ট্রাক্টর বিক্রি হচ্ছে সাড়ে
৮ লাখ থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকায়। এ হিসাবে ট্রাক্টর প্রতি গড় মূল্য দাঁড়ায়
১০ লাখ টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক ও ভ্যাটসহ বাড়তি ১৯ শতাংশ যোগ করলে প্রতিটি
ট্রাক্টরের মূল্য প্রায় ২ লাখ টাকা বেড়ে যাবে।